এইচএসসি: খুলনার ছয় কলেজে পাস শূন্য, পাইকগাছার ১০ কলেজেও ফল বিপর্যয়
- আপডেট সময় : ০৯:০৩:৫৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
- / 7
এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় যশোর বোর্ডের অধীন খুলনা বিভাগের ছয়টি কলেজ থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। বিভাগের ৫৭০টি কলেজের ১ লাখ ১২ হাজার ৭৯১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৫০ হাজার ৬৬৮ জন; অর্থাৎ প্রায় প্রতি দুজনের একজনই অকৃতকার্য হয়েছে। বোর্ডজুড়ে পাসের হার ৪৪ দশমিক ৯২ শতাংশ, যা গত বছরের ৫০ দশমিক ২০ শতাংশের চেয়ে সোয়া পাঁচ শতাংশ কম।
শূন্য পাসের তালিকায় রয়েছে ডুমুরিয়ার মডেল মহিলা কলেজ (পরীক্ষার্থী ৩ জন), খুলনা সদরের ইনডিপেনডেন্ট আইডিয়াল কলেজ (১১ জন), পাইকগাছার কপিলমুনি সহচারী বিদ্যামন্দির (৩ জন), কয়রার শাকবাড়িয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ (২৭ জন), রূপসার কমরেড রতন সেন কলেজিয়েট গার্লস কলেজ (১ জন) এবং খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস স্কুল অ্যান্ড কলেজ (১২ জন)। এর মধ্যে কপিলমুনি সহচারী বিদ্যামন্দির গত বছরও শূন্য পাসের তালিকায় ছিল—অর্থাৎ টানা দুই বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস করতে পারেনি। যশোর বোর্ডে সব মিলিয়ে শূন্য-পাস প্রতিষ্ঠান ১৬টি, আর সারা দেশে এই সংখ্যা ২৯৩টি। বোর্ডে শতভাগ পাস করেছে মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান, যার একটি খালিশপুরের নেভি অ্যাংকরেজ—সেখানে ৬১ জন পরীক্ষার্থীর সবাই পাস করেছে।
পাইকগাছা উপজেলার চিত্র আরও বিস্তৃত। উপজেলার ১০টি কলেজের একটিতেও পাসের হার ৬০ শতাংশ ছুঁতে পারেনি। সবচেয়ে ভালো ফল করা ফসিয়ার রহমান মহিলা কলেজে ১২৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৭৪ জন। পাইকগাছা সরকারি কলেজে ৩০৯ জনের মধ্যে পাস ৮৯ জন (২৮ দশমিক ৮০ শতাংশ), আরকেবিকে হরিশচন্দ্র কলেজে ৪৩৫ জনের মধ্যে ১২৮ জন (২৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ)। শহীদ আয়ুব ও মুসা কলেজে ২৬৬ জন পরীক্ষার্থীর মাত্র ৩৪ জন পাস করেছেন (১২ দশমিক ৭৮ শতাংশ)। আর সরদার আবু হোসেন কলেজে ৩০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র একজন—পাসের হার ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
এত বড় বিপর্যয়ের পর নড়েচড়ে বসেছে যশোর শিক্ষা বোর্ড। বোর্ডের সচিব অধ্যাপক ড. আব্দুল মতিন জানিয়েছেন, শতভাগ অকৃতকার্য হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে; এসব প্রতিষ্ঠানের অধিভুক্তি নবায়ন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে তিনি এই ফলকে ‘বিপর্যয়’ বলতে নারাজ; তাঁর ভাষায়, এটি ‘সঠিক মূল্যায়নের’ প্রতিফলন।
এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সারা দেশে পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। খুলনা অঞ্চলের পতন জাতীয় গড়ের চেয়েও গভীর। প্রশ্ন উঠছে, কেন বারবার একই চিত্র ফিরে আসছে এই অঞ্চলের কলেজগুলোতে।
গত বছরের (২০২৫ সালের) ফল নিয়ে দৈনিক সমকালের এক অনুসন্ধানে খুলনার বেসরকারি কলেজগুলোর যে চিত্র উঠে এসেছিল, তা এই প্রশ্নের একটি দিক তুলে ধরে। ওই অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছিল, এসব কলেজে শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাত গড়ে ১:৫, অথচ নীতিমালা অনুযায়ী আদর্শ অনুপাত ১:৩০। অর্থাৎ শিক্ষক অনেক, শিক্ষার্থী কম। একাধিক কলেজে সেবার পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল শিক্ষকের সংখ্যার চেয়েও কম—মেট্রোপলিটন কলেজে ২৯ জন এমপিওভুক্ত শিক্ষকের বিপরীতে ৬৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছিল মাত্র ৬ জন; মহেশ্বরপাশা শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজে ২০ জন শিক্ষকের কলেজে পাস করেছিল ৭ জন; খুলনা কলেজে ৪২ জন শিক্ষকের বিপরীতে পাস ৩০ জন। এবার শূন্য পাসের তালিকায় থাকা ইনডিপেনডেন্ট আইডিয়াল কলেজেও গত বছর ১৭ জন শিক্ষকের বিপরীতে পাস করেছিল মাত্র ৩ জন।
একদিকে বেঞ্চ খালি করে শিক্ষার্থী কমছে, অন্যদিকে শিক্ষকের বেতন-ভাতা যাচ্ছে নিয়মিত—এই অসামঞ্জস্যই খুলনার কলেজশিক্ষার সংকটের কেন্দ্রে। টানা দুই বছর ধরে একই প্রতিষ্ঠানের নাম শূন্য-পাসের তালিকায় ফিরে আসা ইঙ্গিত দেয়, সমস্যাটি কোনো এক বছরের দুর্ঘটনা নয়। বোর্ডের কারণ দর্শানোর নোটিশ আর অধিভুক্তি বন্ধের হুঁশিয়ারি কতটা বাস্তবে রূপ নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী বছরের ফলে এই তালিকা ছোট হবে নাকি আরও লম্বা হবে।




















