রণক্ষেত্রে পরিণত হলো ইউরোপের রাজপথ: জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া ব্যয় ও জেন-জির ক্ষোভে ফুঁসছে ফ্রান্স-জার্মানি
- আপডেট সময় : ১০:৪৯:৫১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
- / 17
সড়কে জ্বলছে আগুন, সেখানে ব্যাটম্যানের পোশাকে এসেছেন একজন বিক্ষোভকারী। ফ্রাঙ্কফুর্ট, জার্মানি, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ছবি: রয়টার্স
জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া ব্যয়, সরকারের কঠোর ব্যয় সংকোচন নীতি এবং তরুণ প্রজন্মের মতামত ও ভবিষ্যৎকে অবহেলার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে ইউরোপজুড়ে জেন-জির বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে; প্যারিস থেকে বার্লিন কিংবা ওয়ারশ—এক রাতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাজপথ যেন একযোগে রূপ নিয়েছে এক একটি রণক্ষেত্রে। বিশেষ করে হ্যালোইন উদযাপনের পবিত্র উৎসবের রাতটিই ইউরোপের একাধিক শহরে চরম সহিংসতা ও রাজনৈতিক উত্তাপে রূপ নেয়।
ফ্রান্সে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ ও পাঁচ শতাধিক গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে জার্মানিতে নজিরবিহীন লুটপাট ও পেট্রলবোমা হামলা এবং পোল্যান্ডে সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের প্রধানকে বরখাস্ত করাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকটে পুরো ইউরোপজুড়ে এখন চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে।
ফ্রান্স: অর্থনৈতিক সংকট, ব্যয় সংকোচন ও পাঁচ শতাধিক গ্রেপ্তার
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিলের পর রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির নানা বড় শহরে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের তীব্র সংঘর্ষ হয়েছে। স্থানীয় সময় শনিবার সন্ধ্যার পর থেকে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়। প্যারিস, লিওঁ, তুলুজ ও মার্সেই শহরে তরুণেরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখালে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস, কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে।

ছবি: রয়টার্স
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ এই বিক্ষোভে অংশ নেন এবং সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার দায়ে বিভিন্ন শহর থেকে অন্তত ৫৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই তীব্র অসন্তোষের পেছনে মূল কারণ হলো ফ্রান্সের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। দেশটির সরকারি ঋণ বর্তমানে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১২০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে এবং ঋণ নেওয়ার ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সরকার চরম ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। সম্প্রতি শীর্ষস্থানীয় ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা ‘ফিচ’ ফ্রান্সের ঋণের ভবিষ্যৎ অবস্থান ‘নেতিবাচক’ হিসেবে চিহ্নিত করায় বিনিয়োগকারীদের মাঝেও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মূলত শিক্ষাব্যবস্থার চরম অবনতি, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে জটিল ভর্তি পদ্ধতির প্রতিবাদে প্রথমে ফরাসি শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁদের সঙ্গে দেশের বড় বড় শ্রমিক সংগঠন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবিতে সোচ্চার ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনকারীরাও রাজপথে যোগ দেয়।
জার্মানি: ফ্রাঙ্কফুর্টে নজিরবিহীন লুটপাট, পেট্রলবোমা ও জলকামান ব্যবহার

ছবি: রয়টার্স
জার্মানির বেশ কয়েকটি বড় শহরেও তরুণদের নেতৃত্বে পরিচালিত বিক্ষোভ বড় ধরনের সহিংস রূপ নিয়েছে। ‘জেনজি রেগেল্ট!’ নামের একটি তরুণ সংগঠনের ডাকে বার্লিন, কোলন, হামবুর্গ ও ফ্রাঙ্কফুর্টের রাজপথে ১০ হাজারের বেশি তরুণ নেমে আসেন। এর মধ্যে ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের পরিস্থিতি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। সেখানে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন নামী দোকানে ভাঙচুর চালান এবং নজিরবিহীন লুটপাটে অংশ নেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জার্মান পুলিশ জলকামান ও পিপার স্প্রে ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। এ সময় বিক্ষুব্ধ তরুণেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল, আতশবাজি ও একাধিক পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করেন। জরুরি সেবায় নিয়োজিত অগ্নিনির্বাপক ও অ্যাম্বুলেন্স কর্মীদের ওপরও হামলা চালানো হয়। হ্যালোইনের সঙ্গে বিক্ষোভের দিনটি মিলে যাওয়ায় অনেক তরুণ ডাইনোসর, ব্যাটম্যান কিংবা বিভিন্ন বিচিত্র কস্টিউম বা পোশাকে সজ্জিত হয়ে প্রতিবাদে অংশ নেন। জার্মানির বর্তমান রক্ষণশীল চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিক্ষোভকারীদের হাতে ‘প্রতিরোধের সময় এখন’, ‘মের্ৎসকে বিদায় নিতে হবে’ লেখা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। হেসে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমান পোসেক পরে গণমাধ্যমকে জানান, ফ্রাঙ্কফুর্টের এই বিক্ষোভে প্রায় ১০০ জন চিহ্নিত ‘বামপন্থী উগ্রবাদী’ অনুপ্রবেশ করে ইচ্ছাকৃতভাবে সহিংসতা ছড়িয়েছে, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক।
পোল্যান্ড ও ইতালি: রাজনৈতিক সংকট, অভ্যুত্থানের অভিযোগ ও দেশজুড়ে ধর্মঘট

ছবি: রয়টার্স
এদিকে ইউরোপের অন্য দেশগুলোতেও রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে। পোল্যান্ডের সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের কথা বললেও আদালতের প্রধানকে হঠাৎ বরখাস্ত করার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে টানা দ্বিতীয় রাতের মতো রাজপথে নেমে আসেন শত শত মানুষ। সরকারের এই একতরফা পদক্ষেপকে বিরোধীরা সুনির্দিষ্টভাবে একটি ‘অভ্যুত্থান’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারোল নাওরোকি সেনেগাল সফরের উদ্দেশ্যে রওনা হলেও মাঝপথে নিজের উড়োজাহাজ ঘুরিয়ে রাজধানী ওয়ারশে ফিরে আসেন এবং সরাসরি সাংবিধানিক আদালত ভবনে গিয়ে বিক্ষোভের মুখে থাকা বরখাস্ত আদালতপ্রধানকে ভেতরে প্রবেশ করতে সহযোগিতা করেন।
অন্যদিকে, ইতালিতেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি বৃদ্ধি এবং সরকারি জনসেবা আরও জোরদার করার দাবিতে হাজার হাজার মানুষ ধর্মঘট ও বিক্ষোভ করেছেন। বিশেষ করে ইউরোপজুড়ে সামরিক খাতে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় বাড়ানোর নীতির তীব্র সমালোচনা করছেন সাধারণ নাগরিক ও শিক্ষার্থীরা।



















