সেন্টমার্টিন খুলছে কাল, কিন্তু জাহাজ ছাড়ছে না ১ নভেম্বরেই: পর্যটকদের যা জানা দরকার
- আপডেট সময় : ১০:২৪:৫০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
- / 14
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী কাল রোববার (১ নভেম্বর) থেকে পর্যটকদের জন্য খুলে যাচ্ছে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। কিন্তু সেন্টমার্টিনে জাহাজ চলাচল শুরু হচ্ছে না নির্ধারিত দিনেই। একাধিক দপ্তরের অনুমোদন ও ছাড়পত্রের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় পর্যটকবাহী কোনো জাহাজই এখনো চূড়ান্ত চলাচলের অনুমতি পায়নি। ফলে ১ নভেম্বরের টিকিট বা ভ্রমণপরিকল্পনা নিয়ে যাঁরা এগিয়েছেন, তাঁদের অপেক্ষা করতে হবে আরও কয়েক দিন। জাহাজমালিকদের সংগঠন স্কোয়াবের প্রত্যাশা, সব প্রক্রিয়া শেষ হলে ৪ থেকে ৬ নভেম্বরের মধ্যে চলাচল শুরু হতে পারে।
গত ১২ অক্টোবর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সেন্টমার্টিনে পর্যটক যাতায়াতের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর ২৫ অক্টোবর জারি করা চিঠিতে আগের বছরের শর্তগুলো বহাল রাখা হলে পর্যটন-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়; পরে ২৭ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব সাবরীনা রহমান স্বাক্ষরিত সংশোধিত প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করা হয়—১ নভেম্বর ২০২৬ থেকে ১৫ মার্চ ২০২৭ পর্যন্ত পর্যটকেরা দ্বীপে যাতায়াত ও রাতযাপন দুটোই করতে পারবেন। প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার (৩,৫০০) পর্যটক যেতে পারবেন এবং প্রত্যেক পর্যটককে দিতে হবে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি।
আগের মৌসুমের সঙ্গে এবারের বড় পার্থক্য দুটি: গতবার নভেম্বরে শুধু দিনে গিয়ে দিনে ফেরা যেত, রাতযাপন ছিল না—এবার পুরো মৌসুমজুড়েই রাতযাপনের সুযোগ থাকছে। আর দৈনিক পর্যটকের সীমা দুই হাজার থেকে বাড়িয়ে সাড়ে তিন হাজার করা হয়েছে, মৌসুমও বাড়ানো হয়েছে ১৫ দিন।
একটি জাহাজ এই রুটে চলতে হলে শুধু একটি অনুমতিতে কাজ হয় না। সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইনুল ইসলাম বাহাদুর জানিয়েছেন, পরিবেশ মন্ত্রণালয়/পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের পাশাপাশি নৌপরিবহন অধিদপ্তরের অনুমোদন, বিআইডব্লিউটিএর রুট পারমিট এবং কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের অনুমতি—সবগুলোই লাগবে। সংশোধিত প্রজ্ঞাপনেও বলা আছে, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো সংস্থাই জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে পারবে না। কিন্তু এখনো সব ধাপ শেষ হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি প্রস্তুতির ঘাটতি: পর্যটকদের নিবন্ধনের জন্য বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের যে সফটওয়্যার/ওয়েবসাইট চালুর কথা, সেটি এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি বলে জানিয়েছেন অপারেটররা। ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী অবশ্য জানিয়েছেন, ১ নভেম্বর থেকেই নিবন্ধনের জন্য ওয়েবসাইট খুলে দেওয়া হবে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান স্পষ্ট করেছেন, জাহাজের ফিটনেস ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের পরই চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে। গত বছর একটি পর্যটকবাহী জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর এবার নিরাপত্তা যাচাইয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে প্রশাসন।
স্কোয়াবের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত তিনটি জাহাজ—এমবি কর্ণফুলী, বারো আউলিয়া ও এমবি টেকনাফ—পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেয়েছে। এই তিন জাহাজে একসঙ্গে প্রায় ২ হাজার ৩০০ পর্যটক পরিবহন করা সম্ভব। আরও প্রায় সাতটি জাহাজের আবেদন প্রক্রিয়াধীন; সব মিলিয়ে প্রায় ১০টি জাহাজ প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। তবে ছাড়পত্র পেলেই যাত্রা শুরু করা যাচ্ছে না—বাকি দপ্তরগুলোর অনুমোদন না মেলা পর্যন্ত জাহাজগুলোকে ঘাটেই থাকতে হচ্ছে।
এবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো যাত্রার ঘাট। এ মৌসুমে টেকনাফ ঘাট থেকে কোনো পর্যটকবাহী জাহাজ চলবে না; সব জাহাজ ছাড়বে কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে। টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও এই সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছেন। নুনিয়ারছড়া থেকে সেন্টমার্টিনের দূরত্ব প্রায় ১২০ কিলোমিটার—পুরো পথই পাড়ি দিতে হয় বঙ্গোপসাগর দিয়ে।
মৌসুম: ১ নভেম্বর ২০২৬ – ১৫ মার্চ ২০২৭; পুরো সময় রাতযাপনের অনুমতি আছে
দৈনিক সর্বোচ্চ পর্যটক: ৩,৫০০ জন (আগের মৌসুমে ছিল ২,০০০)
পরিবেশ সংরক্ষণ ফি: জনপ্রতি ১০০ টাকা
যাত্রার ঘাট: কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএ ঘাট (টেকনাফ থেকে জাহাজ চলবে না)
ছাড়পত্র পাওয়া জাহাজ: এমবি কর্ণফুলী, বারো আউলিয়া, এমবি টেকনাফ (সম্মিলিত ধারণক্ষমতা প্রায় ২,৩০০)
জাহাজ চলাচল শুরুর সম্ভাব্য সময়: অপারেটরদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ৪–৬ নভেম্বর
যা করবেন:
চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণার আগ পর্যন্ত ভ্রমণের দিন-তারিখ পুরোপুরি নির্দিষ্ট করে ফেলবেন না; ১ নভেম্বরের যাত্রা ধরে হোটেল বা ছুটির পরিকল্পনা করে থাকলে অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারিখ বদলের সুযোগ জেনে নিন।
ট্যুরিজম বোর্ডের নিবন্ধন ওয়েবসাইট চালু হলে সেখানে নিবন্ধন করুন—এবার অনলাইন নিবন্ধন ছাড়া ভ্রমণের সুযোগ থাকছে না।
টিকিট কিনুন শুধু অনুমোদিত জাহাজ/অপারেটরের কাছ থেকে; টিকিট নেওয়ার আগে জাহাজটি চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে কি না যাচাই করুন।
যাত্রার ঘাট হিসেবে নুনিয়ারছড়া ধরে পরিকল্পনা করুন এবং বাজেটে জনপ্রতি ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি রাখুন।
যা করবেন না:
টেকনাফ ঘাটে গিয়ে জাহাজের অপেক্ষা করবেন না—এ মৌসুমে সেখান থেকে কোনো যাত্রীবাহী জাহাজ ছাড়বে না। শাহপরীর দ্বীপ বা উখিয়া থেকেও নৌযানে যাওয়ার সুযোগ নেই।
অনুমোদনহীন ট্রলার বা স্পিডবোটে চড়ার ঝুঁকি নেবেন না; দ্বীপে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম অনুমোদিত পর্যটকবাহী জাহাজ।
অচেনা এজেন্টকে ১ নভেম্বরের যাত্রার কথা বলে অগ্রিম টাকা দেবেন না—ওই দিন কোনো জাহাজই ছাড়ছে না।
জাহাজ চলাচলে দেরি মানে শুধু পর্যটকদের অপেক্ষা নয়। সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম জানিয়েছেন, দ্বীপের প্রায় সাড়ে ১০ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা সরাসরি পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল; মৌসুম সামনে রেখে দুই শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রেস্তোরাঁয় প্রস্তুতি চললেও জাহাজ অনিশ্চিত থাকায় ব্যবসায়ীরা দুশ্চিন্তায় আছেন। প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন জেটির কাজও এখনো শেষ হয়নি; পর্যটকদের নিরাপদ ওঠানামার জন্য পন্টুন ও প্ল্যাটফর্ম দ্রুত মেরামতের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, এই কড়াকড়ির পেছনে আছে দ্বীপটির পরিবেশগত সংবেদনশীলতা। দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা; পর্যটকসংখ্যার সীমা, পরিবেশ ফি আর নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তগুলো এসেছে সেই বাস্তবতা থেকেই। প্রশাসনের ভাষ্য, তাড়াহুড়ো করে অনিরাপদ জাহাজ চলতে দিলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে—আর দ্বীপের পরিবেশের ক্ষতি হলে তা পূরণ হওয়ার নয়।
আজ শনিবার বেলা ১১টায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সঙ্গে জাহাজমালিকদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে; জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, ওই বৈঠকেই জাহাজ চলাচলের তারিখ চূড়ান্ত করা হবে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৪ নভেম্বর পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিন ধার্য করার কথাও জানা গেছে। এখন সবার চোখ সেই সিদ্ধান্তের দিকে—তারিখ ঘোষণা হলেই টিকিট বিক্রি ও নিবন্ধনের গতি বাড়বে, আর দ্বীপের হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোও পাবে চূড়ান্ত প্রস্তুতির সবুজ সংকেত। সিদ্ধান্ত এলে এই প্রতিবেদনে আপডেট জানানো হবে।



















