Dhaka ১১:২৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাভার-আশুলিয়ায় ২৩০ কারখানায় ছুটি, সংঘর্ষ-আগুনে উত্তপ্ত শিল্পাঞ্চল

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় : ০৪:১২:০১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
  • / 16

আশুলিয়ার নরসিংহপুরে আগুন দেওয়া হা-মীম গ্রুপের কাভার্ড ভ্যান। ছবি: সংগৃহীত

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ কয়েক দফা দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ পঞ্চম দিনে গড়াতেই সোমবার আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠল সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল। দিনভর সংঘর্ষ, সড়ক অবরোধ আর অগ্নিসংযোগের মুখে এলাকার কারখানাগুলো একের পর এক সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় — গত কয়েক দিনের আন্দোলন মিলিয়ে সাভার-আশুলিয়ায় এ পর্যন্ত ২৩০ কারখানায় ছুটি দেওয়া হয়েছে, শুধু সোমবারই ছুটি ঘোষণা করা কারখানার সংখ্যা দুই শতাধিক। উৎপাদন বন্ধ থাকায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে শিল্পাঞ্চলটি।

সোমবার সকাল ১০টার পর আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কের নরসিংহপুর ও নিশ্চিন্তপুর এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। একই সময়ে সাভারের হেমায়েতপুরেও ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে এবং লাঠিচার্জ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে; জবাবে ইটপাটকেল ছোড়েন বিক্ষোভকারীরা। দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় দুই পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন, যুগান্তরের প্রতিবেদনে দেড় শতাধিক আহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ইটের আঘাতে আহত হয়েছেন শিল্প পুলিশ-১-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপারেশনস অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স) শোয়েব আহমেদ।

সংঘর্ষের মধ্যেই বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নরসিংহপুরের নদী ফিলিং স্টেশনের সামনে হা-মীম গ্রুপের একটি কারখানার কাভার্ড ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। গাড়িটির সামনের অংশ পুড়ে যায়। আগুন আর অবরোধের জেরে সড়কের পাশের চালু কারখানাগুলোও একে একে ছুটি ঘোষণা করে, ফলে দুপুরের আগেই থমকে যায় পুরো এলাকার উৎপাদন।

ঘটনার শুরুটা হয় আরও সকালে। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নরসিংহপুরের নিউএজ কারখানার শ্রমিকেরা কর্মবিরতি শেষে কারখানা থেকে বেরিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এরপর শ্রমিকেরা প্রথমে অনন্ত গ্রুপের কারখানার সামনে এবং পরে হা-মীম গ্রুপের কারখানার সামনে জড়ো হয়ে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়, যা পরে সংঘর্ষে রূপ নেয়। দুপুর দেড়টা পর্যন্ত এলাকাজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করে, শ্রমিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মুখোমুখি অবস্থানে ছিলেন। আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় দুপুরে বাইপাইল থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; তারা শ্রমিক নাকি বহিরাগত, তা এখনও যাচাই করা হয়নি।

এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাভারের সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু। আরিচা মহাসড়কে দাঁড়িয়ে তিনি অভিযোগ করেন, পতিত সরকারের দোসররা সাভার ও আশুলিয়ায় পোশাক খাতকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে এবং বহিরাগতরা শ্রমিকদের কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে নাশকতা সৃষ্টি করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করছে। সাভার শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকেও একই অভিযোগ করা হয়েছে — বহিরাগতরা শ্রমিকদের কারখানা বন্ধ করে মহাসড়কে নামতে বাধ্য করছে, শান্তিপ্রিয় শ্রমিকরাও কারখানা ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। আশুলিয়া শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানিয়েছেন, শিল্পাঞ্চলে ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তাব্যবস্থা বহাল থাকবে এবং কাভার্ড ভ্যানে আগুনের ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শ্রমিকদের আন্দোলনের মূল দাবি ন্যূনতম মাসিক মজুরি বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করা; পাশাপাশি ছাঁটাই বন্ধ ও শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত না করার দাবিও রয়েছে। এই অসন্তোষ সামাল দিতে রোববারই ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার, আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করেছেন, আন্দোলনের আড়ালে অস্থিরতা সৃষ্টি করলে তা কঠোর হস্তে দমন করা হবে। তবু সোমবার গাজীপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধের মতো সাভার-আশুলিয়াতেও মাঠ ছাড়েননি শ্রমিকরা — আর তারই মূল্য দিতে হচ্ছে ২৩০ কারখানায় ছুটি আর বন্ধ উৎপাদন দিয়ে। বোর্ডের সুপারিশ কত দ্রুত আসে এবং তা শ্রমিকদের আস্থা ফেরাতে পারে কিনা, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতটি।

শেয়ার করুন

সাভার-আশুলিয়ায় ২৩০ কারখানায় ছুটি, সংঘর্ষ-আগুনে উত্তপ্ত শিল্পাঞ্চল

আপডেট সময় : ০৪:১২:০১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ কয়েক দফা দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ পঞ্চম দিনে গড়াতেই সোমবার আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠল সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল। দিনভর সংঘর্ষ, সড়ক অবরোধ আর অগ্নিসংযোগের মুখে এলাকার কারখানাগুলো একের পর এক সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় — গত কয়েক দিনের আন্দোলন মিলিয়ে সাভার-আশুলিয়ায় এ পর্যন্ত ২৩০ কারখানায় ছুটি দেওয়া হয়েছে, শুধু সোমবারই ছুটি ঘোষণা করা কারখানার সংখ্যা দুই শতাধিক। উৎপাদন বন্ধ থাকায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে শিল্পাঞ্চলটি।

সোমবার সকাল ১০টার পর আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কের নরসিংহপুর ও নিশ্চিন্তপুর এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। একই সময়ে সাভারের হেমায়েতপুরেও ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে এবং লাঠিচার্জ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে; জবাবে ইটপাটকেল ছোড়েন বিক্ষোভকারীরা। দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় দুই পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন, যুগান্তরের প্রতিবেদনে দেড় শতাধিক আহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ইটের আঘাতে আহত হয়েছেন শিল্প পুলিশ-১-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপারেশনস অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স) শোয়েব আহমেদ।

সংঘর্ষের মধ্যেই বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নরসিংহপুরের নদী ফিলিং স্টেশনের সামনে হা-মীম গ্রুপের একটি কারখানার কাভার্ড ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। গাড়িটির সামনের অংশ পুড়ে যায়। আগুন আর অবরোধের জেরে সড়কের পাশের চালু কারখানাগুলোও একে একে ছুটি ঘোষণা করে, ফলে দুপুরের আগেই থমকে যায় পুরো এলাকার উৎপাদন।

ঘটনার শুরুটা হয় আরও সকালে। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নরসিংহপুরের নিউএজ কারখানার শ্রমিকেরা কর্মবিরতি শেষে কারখানা থেকে বেরিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এরপর শ্রমিকেরা প্রথমে অনন্ত গ্রুপের কারখানার সামনে এবং পরে হা-মীম গ্রুপের কারখানার সামনে জড়ো হয়ে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়, যা পরে সংঘর্ষে রূপ নেয়। দুপুর দেড়টা পর্যন্ত এলাকাজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করে, শ্রমিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মুখোমুখি অবস্থানে ছিলেন। আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় দুপুরে বাইপাইল থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; তারা শ্রমিক নাকি বহিরাগত, তা এখনও যাচাই করা হয়নি।

এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাভারের সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু। আরিচা মহাসড়কে দাঁড়িয়ে তিনি অভিযোগ করেন, পতিত সরকারের দোসররা সাভার ও আশুলিয়ায় পোশাক খাতকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে এবং বহিরাগতরা শ্রমিকদের কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে নাশকতা সৃষ্টি করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করছে। সাভার শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকেও একই অভিযোগ করা হয়েছে — বহিরাগতরা শ্রমিকদের কারখানা বন্ধ করে মহাসড়কে নামতে বাধ্য করছে, শান্তিপ্রিয় শ্রমিকরাও কারখানা ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। আশুলিয়া শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানিয়েছেন, শিল্পাঞ্চলে ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তাব্যবস্থা বহাল থাকবে এবং কাভার্ড ভ্যানে আগুনের ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শ্রমিকদের আন্দোলনের মূল দাবি ন্যূনতম মাসিক মজুরি বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করা; পাশাপাশি ছাঁটাই বন্ধ ও শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত না করার দাবিও রয়েছে। এই অসন্তোষ সামাল দিতে রোববারই ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার, আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করেছেন, আন্দোলনের আড়ালে অস্থিরতা সৃষ্টি করলে তা কঠোর হস্তে দমন করা হবে। তবু সোমবার গাজীপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধের মতো সাভার-আশুলিয়াতেও মাঠ ছাড়েননি শ্রমিকরা — আর তারই মূল্য দিতে হচ্ছে ২৩০ কারখানায় ছুটি আর বন্ধ উৎপাদন দিয়ে। বোর্ডের সুপারিশ কত দ্রুত আসে এবং তা শ্রমিকদের আস্থা ফেরাতে পারে কিনা, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতটি।