Dhaka ০৪:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্পেনে ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত বেড়ে ৬৯, শনাক্তের অপেক্ষায় স্বজনেরা

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় : ০৩:০৬:৩০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
  • / 20

ছবি: রয়টার্স

স্পেনে ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে রাজধানী মাদ্রিদ থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে তলেদো প্রদেশের উরদা এলাকায় থেমে থাকা একটি হাই-স্পিড ট্রেনের পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয় আরেকটি হাই-স্পিড ট্রেন। আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। নিরাপত্তা ব্যবস্থা অকেজো হয়ে যাওয়ার পর নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে পূর্ণ গতিতে চলার অনুমতি দেওয়া নিয়েই এখন চলছে তদন্ত ও তুমুল রাজনৈতিক বিতর্ক। আর তলেদোর মর্গে ডিএনএ নমুনা দিয়ে প্রিয়জনের খবরের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন শোকাহত স্বজনেরা।

দুর্ঘটনাটি ঘটে মাদ্রিদ-সেভিয়া হাই-স্পিড লাইনে, স্পেনের সবচেয়ে ব্যস্ত দ্রুতগতির রেলপথগুলোর একটিতে। বুধবার সকালে ওই লাইনের এলজেডবি (LZB) নামের স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দিলে প্রায় ৬৩ কিলোমিটার অংশে সব ট্রেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে থেমে যায়। এরপর মাদ্রিদের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে ট্রেন চলাচল সামলানো শুরু হয়।

কর্তৃপক্ষের দেওয়া সময়রেখা অনুযায়ী, সকাল ৮টা ৩৬ মিনিটে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি রেনফের ট্রেনটিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। সামনে বেসরকারি কোম্পানি ইরিয়োর একটি ট্রেন তখনো থেমে ছিল—চালক পরে জানান, তিনি ট্রেনটি আবার চালু করতেই পারছিলেন না। তদন্তকারীদের প্রাথমিক হিসাবে, সংঘর্ষের মুহূর্তে রেনফের ট্রেনটির গতি ছিল ঘণ্টায় ১৬০ থেকে ২০০ কিলোমিটার। সকাল ৮টা ৫৩ মিনিটের দিকে সেটি থেমে থাকা ট্রেনটির পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয়; কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে ঢালুতে গড়িয়ে পড়ে। আঞ্চলিক সরকারের হিসাবে, ইরিয়ো ট্রেনে যাত্রী ছিলেন ১৫১ জন আর রেনফের ট্রেনে ৩৯৩ জন। যাত্রীদের বর্ণনায়, ধাক্কার মুহূর্তে অনেকে আসন থেকে ছিটকে পড়েন, একটি বগিতে আগুন ধরে যায় এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েন অনেকে।

CNN-এর প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছেন পাঁচ শতাধিক জরুরি সেবাকর্মী; ক্রেন দিয়ে সরানো হচ্ছে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া বগি, তল্লাশি চালাচ্ছে প্রশিক্ষিত কুকুরও। তবে নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করাই এখন সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আঞ্চলিক প্রেসিডেন্ট এমিলিয়ানো গার্সিয়া-পাহে জানিয়েছেন, উদ্ধারকর্মীরা খণ্ডিত দেহাবশেষের ৩১টি ব্যাগ সংগ্রহ করেছেন, যা শনাক্তের প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে। শুক্রবার পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছে মাত্র ১২টি মরদেহ।

বিচারিক কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এখনো সক্রিয় আছে ৬৭টি নিখোঁজ ব্যক্তির রিপোর্ট, যার ১৪টি বিদেশি নাগরিকদের—তাঁরা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, জাপান, মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা, ভেনেজুয়েলা, তিউনিসিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্রের নাগরিক। এই তালিকায় এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের নাম নেই। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, নিহতদের মধ্যে ২৭টি পর্যন্ত দেশের নাগরিক থাকতে পারেন। প্রথম নিশ্চিত বিদেশি নিহত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন একটি ট্রেনের পর্তুগিজ ক্রু সদস্য। নিহতদের মধ্যে আছেন সিভিল গার্ডের কর্মকর্তা হোসে মানুয়েল, সাবেক মন্ত্রী ফাতিমা বানিয়েজ এবং ২৪ বছর বয়সী লং জাম্পার হুলিয়েতা গায়েগো। গার্সিয়া-পাহে সতর্ক করে বলেছেন, আরও মৃতদেহ পাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

ঘটনার সময়: বুধবার ২৮ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৮টা ৫৩ মিনিট (স্থানীয় সময়)

স্থান: উরদা, তলেদো প্রদেশ, মাদ্রিদ থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে; মাদ্রিদ-সেভিয়া হাই-স্পিড লাইন

নিহত: অন্তত ৬৯ জন (সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা আছে)

আহত: শতাধিক; শুক্রবার হাসপাতালে ছিলেন ৩৯ জন

ট্রেন দুটি: রাষ্ট্রায়ত্ত রেনফে (যাত্রী ৩৯৩) ও বেসরকারি ইরিয়ো (যাত্রী ১৫১)

কারণ (প্রাথমিক): এলজেডবি নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটির পর নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে পূর্ণ গতিতে চলার অনুমতি

রাষ্ট্রীয় শোক: বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত

পরিবহনমন্ত্রী ওস্কার পুয়েন্তে বলেছেন, লাল সংকেত জ্বলে থাকা সত্ত্বেও নিয়ন্ত্রক রেনফের ট্রেনটিকে “স্বাভাবিক গতিতে” চলার অনুমতি দিয়েছিলেন—অথচ এমন পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ ৪০ কিলোমিটার গতিতে চলার প্রোটোকল ছিল। তাঁর ভাষায়, সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল “ব্যাখ্যাতীত পরিস্থিতিতে”। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হওয়া নিয়ন্ত্রণকক্ষের অডিও রেকর্ডিংয়েও অনুমতির বিষয়টি উঠে এসেছে।

তবে রেলশ্রমিক ইউনিয়নগুলো এই বক্তব্য মানতে নারাজ। অবকাঠামো সংস্থা আদিফের ইউনিয়ন নেতা রাকেল আইয়োনের যুক্তি, মানুষের ভুল নিয়ে দ্রুত আঙুল তোলা হচ্ছে, অথচ আসল প্রশ্ন—নিরাপত্তা ব্যবস্থাটাই কেন অকেজো হলো—সেটি আড়ালে থেকে যাচ্ছে। মন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন, এলজেডবি ব্যবস্থায় বছরে গড়ে প্রায় ১৭০ বার ত্রুটি দেখা দেয়। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন আধুনিক ইউরোপীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ইআরটিএমএস নিয়ে: ২০২১ সালে চুক্তি হলেও মাদ্রিদ-সেভিয়া লাইনে এটি বসানোর কাজ পিছিয়ে গেছে, এখন চালু হওয়ার সম্ভাব্য সময় ২০২৭ সালের শুরু—জানিয়েছেন মন্ত্রী নিজেই। বিরোধী দল পিপির নেতা আলবের্তো নুনিয়েজ ফেইহো অভিযোগ করেছেন, সরকার যথাসময়ে পুরোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা বদলায়নি। অন্যদিকে পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করে পুয়েন্তে বলেছেন, এখন তাঁর দায়িত্ব সমস্যার সমাধান করা, পদ ছাড়া নয়।

এই দুর্ঘটনা একই লাইনে এ বছরের দ্বিতীয় বড় বিপর্যয়। গত জানুয়ারিতে কর্দোবা প্রদেশের আদামুজের কাছে লাইনের ফাটলের কারণে একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে অন্য ট্রেনের সঙ্গে ধাক্কা খায়; নিহত হন ৪৬ জন। তার কয়েক দিন পর বার্সেলোনার কাছে ভারী বৃষ্টির দিনে একটি যাত্রীবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে চালক নিহত হন। ফলে এ বছর স্পেনের রেলপথে এটি তৃতীয় প্রাণঘাতী ঘটনা।

রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে দ্রুত। বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী সানচেজ; তিনি স্বীকার করেছেন, হাই-স্পিড নেটওয়ার্কের প্রতি মানুষের আস্থা “ভেঙে চুরমার” হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেছেন, অবহেলা প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুর্ঘটনার রাতেই মাদ্রিদে বিক্ষোভ হয়েছে; বিক্ষোভকারীদের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল “দুর্নীতিই হত্যা করে”। ট্রেনচালকদের ইউনিয়ন সেমাফ রেল নিরাপত্তায় কাঠামোগত সংস্কারের দাবিতে ১০ ও ১২ নভেম্বর নতুন ধর্মঘট ডেকেছে। সব মিলিয়ে ২৯ নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনের মাত্র চার সপ্তাহ আগে এই বিপর্যয় জনমত জরিপে পিছিয়ে থাকা সানচেজ সরকারের জন্য বড় ধাক্কা।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম (চীনের পর) এবং ইউরোপের সবচেয়ে বিস্তৃত হাই-স্পিড নেটওয়ার্ক স্পেনের—এটি দীর্ঘদিন দেশটির শিল্পনীতির সাফল্য হিসেবে দেখা হতো। তিন দশকের বেশি সময় ধরে এই নেটওয়ার্কে কোনো প্রাণঘাতী দুর্ঘটনাই ঘটেনি; ইউরোপীয় ইউনিয়নের হিসাবে ২০২৩ সালে রেল নিরাপত্তায় স্পেন ছিল ইউরোপের সেরাদের সারিতে। দেশটির সবচেয়ে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা ছিল ২০১৩ সালে সান্তিয়াগো দে কম্পোস্তেলায় লাইনচ্যুতির ঘটনা, যেখানে ৭৯ জন নিহত হন—বর্তমান দুর্ঘটনাটি ২০১৩ সালের পর স্পেনের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ট্রেন দুর্ঘটনা। এই পটভূমিতে একই বছরে একই লাইনে দুটি বড় বিপর্যয় শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং রক্ষণাবেক্ষণ, পুরোনো প্রযুক্তি বদলানোর গতি এবং চাপের মুখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি—সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

বাংলাদেশের পাঠকের জন্য এই ঘটনার দুটি দিক গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, স্পেনে বড় একটি বাংলাদেশি কমিউনিটি বসবাস করে; তবে নিখোঁজ বিদেশিদের এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই—এটি স্বস্তির খবর হলেও শনাক্তের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত তালিকা বলা যাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশও রেল খাতে বড় বিনিয়োগ ও দ্রুতগতির রেলের পরিকল্পনার যুগে ঢুকছে। স্পেনের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু আধুনিক ট্রেন আর লাইন থাকলেই নিরাপত্তা আসে না—নিরাপত্তা ব্যবস্থার হালনাগাদ পিছিয়ে গেলে এবং জরুরি মুহূর্তে প্রোটোকল ভাঙলে সর্বাধুনিক নেটওয়ার্কও বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।

সামনে নজর থাকবে স্বাধীন তদন্ত সংস্থা ও বিচারিক তদন্তের প্রতিবেদনের দিকে—দুটি তদন্তই চলছে। এখনো যা জানা যায়নি: নিয়ন্ত্রক কেন পূর্ণ গতির অনুমতি দিলেন তার পূর্ণ ব্যাখ্যা, এলজেডবি ব্যবস্থা ঠিক কী কারণে অকেজো হলো, আর মোট নিহতের চূড়ান্ত সংখ্যা। তদন্তের ফল ও নিহতদের পূর্ণ তালিকা প্রকাশ হলে এই প্রতিবেদনে আপডেট জানানো হবে।

শেয়ার করুন

স্পেনে ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত বেড়ে ৬৯, শনাক্তের অপেক্ষায় স্বজনেরা

আপডেট সময় : ০৩:০৬:৩০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

স্পেনে ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে রাজধানী মাদ্রিদ থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে তলেদো প্রদেশের উরদা এলাকায় থেমে থাকা একটি হাই-স্পিড ট্রেনের পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয় আরেকটি হাই-স্পিড ট্রেন। আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। নিরাপত্তা ব্যবস্থা অকেজো হয়ে যাওয়ার পর নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে পূর্ণ গতিতে চলার অনুমতি দেওয়া নিয়েই এখন চলছে তদন্ত ও তুমুল রাজনৈতিক বিতর্ক। আর তলেদোর মর্গে ডিএনএ নমুনা দিয়ে প্রিয়জনের খবরের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন শোকাহত স্বজনেরা।

দুর্ঘটনাটি ঘটে মাদ্রিদ-সেভিয়া হাই-স্পিড লাইনে, স্পেনের সবচেয়ে ব্যস্ত দ্রুতগতির রেলপথগুলোর একটিতে। বুধবার সকালে ওই লাইনের এলজেডবি (LZB) নামের স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দিলে প্রায় ৬৩ কিলোমিটার অংশে সব ট্রেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে থেমে যায়। এরপর মাদ্রিদের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে ট্রেন চলাচল সামলানো শুরু হয়।

কর্তৃপক্ষের দেওয়া সময়রেখা অনুযায়ী, সকাল ৮টা ৩৬ মিনিটে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি রেনফের ট্রেনটিকে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। সামনে বেসরকারি কোম্পানি ইরিয়োর একটি ট্রেন তখনো থেমে ছিল—চালক পরে জানান, তিনি ট্রেনটি আবার চালু করতেই পারছিলেন না। তদন্তকারীদের প্রাথমিক হিসাবে, সংঘর্ষের মুহূর্তে রেনফের ট্রেনটির গতি ছিল ঘণ্টায় ১৬০ থেকে ২০০ কিলোমিটার। সকাল ৮টা ৫৩ মিনিটের দিকে সেটি থেমে থাকা ট্রেনটির পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয়; কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে ঢালুতে গড়িয়ে পড়ে। আঞ্চলিক সরকারের হিসাবে, ইরিয়ো ট্রেনে যাত্রী ছিলেন ১৫১ জন আর রেনফের ট্রেনে ৩৯৩ জন। যাত্রীদের বর্ণনায়, ধাক্কার মুহূর্তে অনেকে আসন থেকে ছিটকে পড়েন, একটি বগিতে আগুন ধরে যায় এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েন অনেকে।

CNN-এর প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছেন পাঁচ শতাধিক জরুরি সেবাকর্মী; ক্রেন দিয়ে সরানো হচ্ছে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া বগি, তল্লাশি চালাচ্ছে প্রশিক্ষিত কুকুরও। তবে নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করাই এখন সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আঞ্চলিক প্রেসিডেন্ট এমিলিয়ানো গার্সিয়া-পাহে জানিয়েছেন, উদ্ধারকর্মীরা খণ্ডিত দেহাবশেষের ৩১টি ব্যাগ সংগ্রহ করেছেন, যা শনাক্তের প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে। শুক্রবার পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছে মাত্র ১২টি মরদেহ।

বিচারিক কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এখনো সক্রিয় আছে ৬৭টি নিখোঁজ ব্যক্তির রিপোর্ট, যার ১৪টি বিদেশি নাগরিকদের—তাঁরা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, জাপান, মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা, ভেনেজুয়েলা, তিউনিসিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্রের নাগরিক। এই তালিকায় এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের নাম নেই। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, নিহতদের মধ্যে ২৭টি পর্যন্ত দেশের নাগরিক থাকতে পারেন। প্রথম নিশ্চিত বিদেশি নিহত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন একটি ট্রেনের পর্তুগিজ ক্রু সদস্য। নিহতদের মধ্যে আছেন সিভিল গার্ডের কর্মকর্তা হোসে মানুয়েল, সাবেক মন্ত্রী ফাতিমা বানিয়েজ এবং ২৪ বছর বয়সী লং জাম্পার হুলিয়েতা গায়েগো। গার্সিয়া-পাহে সতর্ক করে বলেছেন, আরও মৃতদেহ পাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

ঘটনার সময়: বুধবার ২৮ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৮টা ৫৩ মিনিট (স্থানীয় সময়)

স্থান: উরদা, তলেদো প্রদেশ, মাদ্রিদ থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে; মাদ্রিদ-সেভিয়া হাই-স্পিড লাইন

নিহত: অন্তত ৬৯ জন (সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা আছে)

আহত: শতাধিক; শুক্রবার হাসপাতালে ছিলেন ৩৯ জন

ট্রেন দুটি: রাষ্ট্রায়ত্ত রেনফে (যাত্রী ৩৯৩) ও বেসরকারি ইরিয়ো (যাত্রী ১৫১)

কারণ (প্রাথমিক): এলজেডবি নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটির পর নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে পূর্ণ গতিতে চলার অনুমতি

রাষ্ট্রীয় শোক: বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত

পরিবহনমন্ত্রী ওস্কার পুয়েন্তে বলেছেন, লাল সংকেত জ্বলে থাকা সত্ত্বেও নিয়ন্ত্রক রেনফের ট্রেনটিকে “স্বাভাবিক গতিতে” চলার অনুমতি দিয়েছিলেন—অথচ এমন পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ ৪০ কিলোমিটার গতিতে চলার প্রোটোকল ছিল। তাঁর ভাষায়, সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল “ব্যাখ্যাতীত পরিস্থিতিতে”। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হওয়া নিয়ন্ত্রণকক্ষের অডিও রেকর্ডিংয়েও অনুমতির বিষয়টি উঠে এসেছে।

তবে রেলশ্রমিক ইউনিয়নগুলো এই বক্তব্য মানতে নারাজ। অবকাঠামো সংস্থা আদিফের ইউনিয়ন নেতা রাকেল আইয়োনের যুক্তি, মানুষের ভুল নিয়ে দ্রুত আঙুল তোলা হচ্ছে, অথচ আসল প্রশ্ন—নিরাপত্তা ব্যবস্থাটাই কেন অকেজো হলো—সেটি আড়ালে থেকে যাচ্ছে। মন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন, এলজেডবি ব্যবস্থায় বছরে গড়ে প্রায় ১৭০ বার ত্রুটি দেখা দেয়। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন আধুনিক ইউরোপীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ইআরটিএমএস নিয়ে: ২০২১ সালে চুক্তি হলেও মাদ্রিদ-সেভিয়া লাইনে এটি বসানোর কাজ পিছিয়ে গেছে, এখন চালু হওয়ার সম্ভাব্য সময় ২০২৭ সালের শুরু—জানিয়েছেন মন্ত্রী নিজেই। বিরোধী দল পিপির নেতা আলবের্তো নুনিয়েজ ফেইহো অভিযোগ করেছেন, সরকার যথাসময়ে পুরোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা বদলায়নি। অন্যদিকে পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করে পুয়েন্তে বলেছেন, এখন তাঁর দায়িত্ব সমস্যার সমাধান করা, পদ ছাড়া নয়।

এই দুর্ঘটনা একই লাইনে এ বছরের দ্বিতীয় বড় বিপর্যয়। গত জানুয়ারিতে কর্দোবা প্রদেশের আদামুজের কাছে লাইনের ফাটলের কারণে একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে অন্য ট্রেনের সঙ্গে ধাক্কা খায়; নিহত হন ৪৬ জন। তার কয়েক দিন পর বার্সেলোনার কাছে ভারী বৃষ্টির দিনে একটি যাত্রীবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে চালক নিহত হন। ফলে এ বছর স্পেনের রেলপথে এটি তৃতীয় প্রাণঘাতী ঘটনা।

রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে দ্রুত। বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী সানচেজ; তিনি স্বীকার করেছেন, হাই-স্পিড নেটওয়ার্কের প্রতি মানুষের আস্থা “ভেঙে চুরমার” হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেছেন, অবহেলা প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুর্ঘটনার রাতেই মাদ্রিদে বিক্ষোভ হয়েছে; বিক্ষোভকারীদের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল “দুর্নীতিই হত্যা করে”। ট্রেনচালকদের ইউনিয়ন সেমাফ রেল নিরাপত্তায় কাঠামোগত সংস্কারের দাবিতে ১০ ও ১২ নভেম্বর নতুন ধর্মঘট ডেকেছে। সব মিলিয়ে ২৯ নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনের মাত্র চার সপ্তাহ আগে এই বিপর্যয় জনমত জরিপে পিছিয়ে থাকা সানচেজ সরকারের জন্য বড় ধাক্কা।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম (চীনের পর) এবং ইউরোপের সবচেয়ে বিস্তৃত হাই-স্পিড নেটওয়ার্ক স্পেনের—এটি দীর্ঘদিন দেশটির শিল্পনীতির সাফল্য হিসেবে দেখা হতো। তিন দশকের বেশি সময় ধরে এই নেটওয়ার্কে কোনো প্রাণঘাতী দুর্ঘটনাই ঘটেনি; ইউরোপীয় ইউনিয়নের হিসাবে ২০২৩ সালে রেল নিরাপত্তায় স্পেন ছিল ইউরোপের সেরাদের সারিতে। দেশটির সবচেয়ে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা ছিল ২০১৩ সালে সান্তিয়াগো দে কম্পোস্তেলায় লাইনচ্যুতির ঘটনা, যেখানে ৭৯ জন নিহত হন—বর্তমান দুর্ঘটনাটি ২০১৩ সালের পর স্পেনের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ট্রেন দুর্ঘটনা। এই পটভূমিতে একই বছরে একই লাইনে দুটি বড় বিপর্যয় শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং রক্ষণাবেক্ষণ, পুরোনো প্রযুক্তি বদলানোর গতি এবং চাপের মুখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি—সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

বাংলাদেশের পাঠকের জন্য এই ঘটনার দুটি দিক গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, স্পেনে বড় একটি বাংলাদেশি কমিউনিটি বসবাস করে; তবে নিখোঁজ বিদেশিদের এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তালিকায় বাংলাদেশের নাম নেই—এটি স্বস্তির খবর হলেও শনাক্তের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত তালিকা বলা যাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশও রেল খাতে বড় বিনিয়োগ ও দ্রুতগতির রেলের পরিকল্পনার যুগে ঢুকছে। স্পেনের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু আধুনিক ট্রেন আর লাইন থাকলেই নিরাপত্তা আসে না—নিরাপত্তা ব্যবস্থার হালনাগাদ পিছিয়ে গেলে এবং জরুরি মুহূর্তে প্রোটোকল ভাঙলে সর্বাধুনিক নেটওয়ার্কও বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।

সামনে নজর থাকবে স্বাধীন তদন্ত সংস্থা ও বিচারিক তদন্তের প্রতিবেদনের দিকে—দুটি তদন্তই চলছে। এখনো যা জানা যায়নি: নিয়ন্ত্রক কেন পূর্ণ গতির অনুমতি দিলেন তার পূর্ণ ব্যাখ্যা, এলজেডবি ব্যবস্থা ঠিক কী কারণে অকেজো হলো, আর মোট নিহতের চূড়ান্ত সংখ্যা। তদন্তের ফল ও নিহতদের পূর্ণ তালিকা প্রকাশ হলে এই প্রতিবেদনে আপডেট জানানো হবে।