Dhaka ১২:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পোশাক খাতের অস্থিরতা: মজুরির ন্যায্য নিষ্পত্তিতে বিলম্ব নয়

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় : ১১:১১:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
  • / 10

পোশাক কারখানায় সেলাই মেশিনে কাজ করছেন একজন শ্রমিক। ছবি: সংগৃহীত

পোশাক খাতের অস্থিরতা আবারও দেশের অর্থনীতির কেন্দ্রে উঠে এসেছে। গত দুই দিনে মিরপুর, গাজীপুর ও সাভার-আশুলিয়ায় শ্রমিক বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ, সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এই অস্থিরতার মূলে রয়েছে একটি পুরোনো কিন্তু অমীমাংসিত প্রশ্ন — শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি। প্রশ্নটির নিষ্পত্তি যত বিলম্বিত হবে, সড়কের উত্তেজনা ততই বাড়বে।

শ্রমিকদের দাবি স্পষ্ট: ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা। বর্তমান ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। দুই অঙ্কের ব্যবধানই বলে দেয়, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের দূরত্ব কতটা বেড়েছে। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম, বাসাভাড়া, চিকিৎসা আর সন্তানের পড়াশোনার খরচ — সবকিছুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা আজকের মজুরিতে কতটা কঠিন, তা প্রতিটি শ্রমিক পরিবার প্রতিদিন টের পাচ্ছে। তাই এই দাবিকে শুধু আন্দোলনের স্লোগান হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি লক্ষ মানুষের বেঁচে থাকার হিসাব।

সুখের কথা, সরকার বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিক পথে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ১ নভেম্বর শ্রমমন্ত্রী বিচারপতি আশফাকুর রহমানের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু বোর্ড গঠনই যথেষ্ট নয়; আসল প্রশ্ন হলো সিদ্ধান্তের গতি ও গ্রহণযোগ্যতা। নতুন মজুরির অঙ্ক এখনো ঠিক হয়নি, আর এই অনিশ্চয়তাই মাঠের উত্তেজনাকে জিইয়ে রাখছে। মজুরি বোর্ডকে তাই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে, সব পক্ষের বক্তব্য শুনে, বাস্তবসম্মত একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। অতীতে দেখা গেছে, মজুরির প্রশ্নে দীর্ঘসূত্রতা প্রতিবারই সংকটকে আরও বড় করেছে।

তবে দাবির ন্যায্যতা আর আন্দোলনের পদ্ধতি এক কথা নয়। মহাসড়ক অবরোধ করে হাজারো মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলা, পুলিশের গাড়ি ও পুলিশ ভ্যানে আগুন দেওয়া, ঝুটের গুদাম পুড়িয়ে দেওয়া — এসব কোনোভাবেই শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষা করে না। গাজীপুরে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করতে হয়েছে; প্রায় ছয় ঘণ্টা মহাসড়ক বন্ধ থাকার পর যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। এই সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাধারণ যাত্রী, ব্যবসায়ী, আর শেষ পর্যন্ত রপ্তানিমুখী শিল্পই। আগুনে পুড়লে কারখানা বন্ধ হয়, অর্ডার সরে যায়, আর সবার আগে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন শ্রমিক নিজেই। পোশাক খাতের অস্থিরতা এভাবে দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতিটা সবার; সবচেয়ে বেশি তাদেরই, যাদের দাবি নিয়ে এই আন্দোলন।

অন্যদিকে, মালিকপক্ষের ভূমিকাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। কোনাবাড়ীসহ কয়েক এলাকার কারখানায় সাধারণ ছুটি, সাভার-আশুলিয়ায় এক দিনে ২৩০ কারখানায় ছুটি — গণছুটি বা কারখানা বন্ধের চাপ দিয়ে সংকট মোকাবিলা করা যায় না। বিজিএমইএ কারখানা বন্ধের ঝুঁকির কথা বলেছে, ৫২৯ কারখানায় উৎপাদন বন্ধের খবরও এসেছে। এসব চাপে শ্রমিকের অনিশ্চয়তা বাড়ে, আস্থা কমে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সতর্ক করে বলেছেন, আন্দোলনের আড়ালে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা হলে কঠোর হস্তে দমন করা হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা সরকারের দায়িত্ব, তাতে সন্দেহ নেই; কিন্তু শুধু দমনের ভাষায় এই সংকটের স্থায়ী সমাধান আসবে না। সমাধান আসবে আলোচনার টেবিলে, যেখানে দাবি, সক্ষমতা ও অর্থনীতির বাস্তবতা — তিনটিই খোলামেলা বিচার হবে।

সরকার ইতিমধ্যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে — ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর জরুরি বৈঠক এবং পরে পোশাক খাতে অস্থিরতা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশ তারই প্রমাণ। এখন প্রয়োজন সেই গুরুত্বকে দ্রুত সিদ্ধান্তে রূপ দেওয়া। মজুরি বোর্ডের কাজের সময়সূচি প্রকাশ করা হোক, যাতে শ্রমিক জানতে পারেন কবে সিদ্ধান্ত আসছে। অনিশ্চয়তার শূন্যতাই গুজব ও উত্তেজনার সবচেয়ে বড় জ্বালানি।

শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব তিন পক্ষেরই। সরকারকে হতে হবে দ্রুত ও নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী, মালিকপক্ষকে আসতে হবে বাস্তবতা মেনে আলোচনায়, আর শ্রমিক নেতৃত্বকে রাখতে হবে আন্দোলনকে শান্তিপূর্ণ ও দাবিকেন্দ্রিক। পোশাক খাত শুধু একটি শিল্প নয়; এটি দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস আর লক্ষ পরিবারের জীবিকা। এই খাতের স্থিতি মানেই সেই পরিবারগুলোর নিরাপত্তা। মজুরির ন্যায্য নিষ্পত্তি তাই বিলম্বের বিষয় নয় — এটি এখন সময়ের দাবি।

শেয়ার করুন

পোশাক খাতের অস্থিরতা: মজুরির ন্যায্য নিষ্পত্তিতে বিলম্ব নয়

আপডেট সময় : ১১:১১:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

পোশাক খাতের অস্থিরতা আবারও দেশের অর্থনীতির কেন্দ্রে উঠে এসেছে। গত দুই দিনে মিরপুর, গাজীপুর ও সাভার-আশুলিয়ায় শ্রমিক বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ, সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এই অস্থিরতার মূলে রয়েছে একটি পুরোনো কিন্তু অমীমাংসিত প্রশ্ন — শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি। প্রশ্নটির নিষ্পত্তি যত বিলম্বিত হবে, সড়কের উত্তেজনা ততই বাড়বে।

শ্রমিকদের দাবি স্পষ্ট: ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা। বর্তমান ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। দুই অঙ্কের ব্যবধানই বলে দেয়, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের দূরত্ব কতটা বেড়েছে। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম, বাসাভাড়া, চিকিৎসা আর সন্তানের পড়াশোনার খরচ — সবকিছুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা আজকের মজুরিতে কতটা কঠিন, তা প্রতিটি শ্রমিক পরিবার প্রতিদিন টের পাচ্ছে। তাই এই দাবিকে শুধু আন্দোলনের স্লোগান হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি লক্ষ মানুষের বেঁচে থাকার হিসাব।

সুখের কথা, সরকার বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিক পথে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ১ নভেম্বর শ্রমমন্ত্রী বিচারপতি আশফাকুর রহমানের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু বোর্ড গঠনই যথেষ্ট নয়; আসল প্রশ্ন হলো সিদ্ধান্তের গতি ও গ্রহণযোগ্যতা। নতুন মজুরির অঙ্ক এখনো ঠিক হয়নি, আর এই অনিশ্চয়তাই মাঠের উত্তেজনাকে জিইয়ে রাখছে। মজুরি বোর্ডকে তাই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে, সব পক্ষের বক্তব্য শুনে, বাস্তবসম্মত একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। অতীতে দেখা গেছে, মজুরির প্রশ্নে দীর্ঘসূত্রতা প্রতিবারই সংকটকে আরও বড় করেছে।

তবে দাবির ন্যায্যতা আর আন্দোলনের পদ্ধতি এক কথা নয়। মহাসড়ক অবরোধ করে হাজারো মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলা, পুলিশের গাড়ি ও পুলিশ ভ্যানে আগুন দেওয়া, ঝুটের গুদাম পুড়িয়ে দেওয়া — এসব কোনোভাবেই শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষা করে না। গাজীপুরে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করতে হয়েছে; প্রায় ছয় ঘণ্টা মহাসড়ক বন্ধ থাকার পর যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। এই সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাধারণ যাত্রী, ব্যবসায়ী, আর শেষ পর্যন্ত রপ্তানিমুখী শিল্পই। আগুনে পুড়লে কারখানা বন্ধ হয়, অর্ডার সরে যায়, আর সবার আগে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন শ্রমিক নিজেই। পোশাক খাতের অস্থিরতা এভাবে দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতিটা সবার; সবচেয়ে বেশি তাদেরই, যাদের দাবি নিয়ে এই আন্দোলন।

অন্যদিকে, মালিকপক্ষের ভূমিকাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। কোনাবাড়ীসহ কয়েক এলাকার কারখানায় সাধারণ ছুটি, সাভার-আশুলিয়ায় এক দিনে ২৩০ কারখানায় ছুটি — গণছুটি বা কারখানা বন্ধের চাপ দিয়ে সংকট মোকাবিলা করা যায় না। বিজিএমইএ কারখানা বন্ধের ঝুঁকির কথা বলেছে, ৫২৯ কারখানায় উৎপাদন বন্ধের খবরও এসেছে। এসব চাপে শ্রমিকের অনিশ্চয়তা বাড়ে, আস্থা কমে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সতর্ক করে বলেছেন, আন্দোলনের আড়ালে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা হলে কঠোর হস্তে দমন করা হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা সরকারের দায়িত্ব, তাতে সন্দেহ নেই; কিন্তু শুধু দমনের ভাষায় এই সংকটের স্থায়ী সমাধান আসবে না। সমাধান আসবে আলোচনার টেবিলে, যেখানে দাবি, সক্ষমতা ও অর্থনীতির বাস্তবতা — তিনটিই খোলামেলা বিচার হবে।

সরকার ইতিমধ্যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে — ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর জরুরি বৈঠক এবং পরে পোশাক খাতে অস্থিরতা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশ তারই প্রমাণ। এখন প্রয়োজন সেই গুরুত্বকে দ্রুত সিদ্ধান্তে রূপ দেওয়া। মজুরি বোর্ডের কাজের সময়সূচি প্রকাশ করা হোক, যাতে শ্রমিক জানতে পারেন কবে সিদ্ধান্ত আসছে। অনিশ্চয়তার শূন্যতাই গুজব ও উত্তেজনার সবচেয়ে বড় জ্বালানি।

শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব তিন পক্ষেরই। সরকারকে হতে হবে দ্রুত ও নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী, মালিকপক্ষকে আসতে হবে বাস্তবতা মেনে আলোচনায়, আর শ্রমিক নেতৃত্বকে রাখতে হবে আন্দোলনকে শান্তিপূর্ণ ও দাবিকেন্দ্রিক। পোশাক খাত শুধু একটি শিল্প নয়; এটি দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস আর লক্ষ পরিবারের জীবিকা। এই খাতের স্থিতি মানেই সেই পরিবারগুলোর নিরাপত্তা। মজুরির ন্যায্য নিষ্পত্তি তাই বিলম্বের বিষয় নয় — এটি এখন সময়ের দাবি।