যেকোনো মূল্যে ডিসেম্বরে দেশে ফিরব: এপিকে শেখ হাসিনা
- আপডেট সময় : ০৪:০৪:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
- / 1
শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন — মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়েও এই সিদ্ধান্তে অটল থাকার কথা আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া এক লিখিত সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। গ্রেপ্তার, কারাবাস কিংবা মৃত্যুর ঝুঁকি জেনেও তিনি দেশে ফিরবেন বলে স্পষ্ট করেছেন। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়।
“মৃত্যু যদি আমার নিয়তি হয়, তাহলে আমি আমার নিজের দেশের মাটিতে, নিজের মানুষের মাঝে মৃত্যুবরণ করতেই বেশি পছন্দ করব। তাই আমি বাংলাদেশে ফিরে যাব। সেই সিদ্ধান্তের কোনো পরিবর্তন হয়নি” — এপির প্রশ্নের জবাবে লিখিতভাবে এ কথা বলেন হাসিনা।
ফিরলে কী হতে পারে, সে বিষয়েও কোনো ধোঁয়াশা রাখেননি তিনি। “আমি জানি, ফিরলে আমাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। আমাকে কারাগারে রাখা, নির্যাতন করা, এমনকি হত্যাও করা হতে পারে। আমি এসব সম্ভাবনার কথা পুরোপুরি জানি। কিন্তু দূর থেকে আমার মানুষের কষ্ট দেখে বাকি জীবন কাটাতে পারব না” — বলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী।
এপি জানিয়েছে, গত সপ্তাহে হাসিনার কাছে প্রশ্ন পাঠানো হয়েছিল এবং বুধবার তিনি লিখিত জবাব দেন। তবে কীভাবে তিনি ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরবেন, তা জানাননি। দেশে পৌঁছালে তাঁকে গ্রেপ্তারের মুখে পড়তে হতে পারে।
ডিসেম্বরে ফেরার ইচ্ছার কথা হাসিনা প্রথম জানিয়েছিলেন গত আগস্টে। আজকের সাক্ষাৎকারে তিনি সেই সিদ্ধান্তই পুনর্ব্যক্ত করলেন — এটি নতুন ঘোষণা নয়, আগের অবস্থানেরই পুনরাবৃত্তি।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে তিনি ভারতে আশ্রয় নেন এবং তখন থেকে সেখানেই রয়েছেন। ২০২৫ সালে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়নের দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ওই দমন-পীড়নে প্রায় এক হাজার ৪০০ জন নিহত হয়েছিলেন বলে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। হাসিনা অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং রায়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিচারের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।
রায়ের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হাসিনার সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের প্রক্রিয়াও এগিয়ে নিচ্ছে। এর আগে ট্রাইব্যুনাল-২-এ আমু-দীপু মনিসহ সাত নেতার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হয়েছিল। এদিকে বাংলাদেশ বারবার তাঁর প্রত্যর্পণ চাইলেও ভারত এখনো তাঁকে হস্তান্তর করেনি।
ক্ষমতাচ্যুতির পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে প্রায় ১৮ মাস দেশ পরিচালনা করে। এরপর ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তারেক রহমান বিপুল জয় পান। ওই নির্বাচনে হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। দলটি এখন নিষিদ্ধ এবং এর জ্যেষ্ঠ নেতারা গ্রেপ্তার হয়েছেন বা নির্বাসনে রয়েছেন।
সাক্ষাৎকারে হাসিনা অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে তাঁর দলের অন্তত ২০ হাজার কর্মী নিহত হয়েছেন, আর হাজার হাজার কর্মীকে গ্রেপ্তার, নির্যাতন বা আত্মগোপনে বাধ্য করা হয়েছে। তবে এই সংখ্যার বিষয়ে স্বাধীন কোনো যাচাই নেই — এটি তাঁর অভিযোগ হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে। “দেশে স্বাভাবিক রাজনৈতিক বা গণতান্ত্রিক পরিবেশ নেই” — দাবি করে তিনি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দলকে পদ্ধতিগতভাবে দমনের অভিযোগ আনেন।
ফেরার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতসহ কোনো দেশ চাপ দেবে কি না — এমন প্রশ্নে হাসিনা বলেন, তিনি কোনো বিদেশি সুরক্ষা চান না। “সব জাতির সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতাকে আমি মূল্য দিই। এটাই সবসময় আমাদের পররাষ্ট্রনীতি ছিল। কিন্তু নিজের দেশে ফেরার জন্য কোনো বিদেশি শক্তির আশীর্বাদের প্রয়োজন আমার নেই” — বলেন তিনি।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে হাসিনা বলেন, চরমপন্থি উপাদানগুলো আগের চেয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য এপি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রেস উইংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা সাড়া দেয়নি।
হাসিনার ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি — কবে, কীভাবে ফিরবেন, আর ফিরলে আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁর কী হবে। তবে মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে দেশে ফেরার এই ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।


















